মুঠোফোন এখন দেশেই ত...
 
Notifications
Clear all

মুঠোফোন এখন দেশেই তৈরি হয়


forumemi_emiforum
Posts: 6
Admin
Topic starter
(@forumemi_emiforum)
Member
Joined: 6 months ago
যা ছিল স্বপ্ন, তা এখন বাস্তব। মুঠোফোন তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশেই। শুধু কথা বলার জন্য ফিচার ফোন নয়, উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যবহার উপযোগী স্মার্টফোনও তৈরি হচ্ছে এ দেশের কারখানায়। মুঠোফোন কেনার সময় আপনি যদি একটু খেয়াল করে মোড়কটি দেখেন, তাহলে দেখবেন লেখা আছে ‘বাংলাদেশে তৈরি’ অথবা ‘বাংলাদেশে সংযোজিত’।

এর মানে হলো, কেউ দেশেই মুঠোফোন তৈরি করে। আবার কেউ কেউ তৈরির পথে প্রথম ধাপ, অর্থাৎ সংযোজনে রয়েছে। যেমন দেশি ব্র্যান্ড ওয়ালটনের মুঠোফোন বাংলাদেশে তৈরি হচ্ছে। তেমনি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া স্মার্টফোনের ব্র্যান্ড স্যামসাংয়ের মুঠোফোন বাংলাদেশে সংযোজিত হচ্ছে। আরেক দেশি ব্র্যান্ড সিম্ফনি, দ্রুত অগ্রসরমাণ চীনা ব্র্যান্ড অপো, ভিভো, টেকনো ও ভারতীয় ব্র্যান্ড লাভা বাংলাদেশে কারখানা করেছে। কারখানা রয়েছে ফাইভস্টার ও উইনস্টার নামে দুটি ব্র্যান্ডেরও। সব মিলিয়ে কারখানার সংখ্যা ৯। নতুন করে এসেছে চীনা ব্র্যান্ড রিয়েলমি। তাদের কারখানাও গাজীপুরে।

আপনি হয়তো ভাবতে পারেন, সস্তার স্মার্টফোন সংযোজন বা তৈরি কঠিন কিছু নয়। তাহলে আপনার জানা দরকার, স্যামসাংয়ের নোট ১০ প্লাস এখন বাংলাদেশেই সংযোজিত হয়। দেশে সংযোজন করে ১ লাখ ৪৪ হাজার টাকার ফোনের দাম ৩০ হাজার টাকা কমিয়েছে স্যামসাং। নতুন আসা এস-২০ সিরিজের ফোনও বাংলাদেশেই সংযোজন করছে স্যামসাং।

আপনি সংযোজনশিল্পকে গুরুত্ব দিতে চান না, তাহলে আপনার আরও কিছুটা জানা দরকার। আগেই বলেছি, ওয়ালটন স্মার্টফোন দেশেই তৈরি হয়। আরেকটি নতুন খবর জানুন, কয়েক মাস পরেই স্যামসাংয়ের মাদারবোর্ড বাংলাদেশে তৈরি শুরু হবে। সিম্ফনি নতুন কারখানা করছে। সেখানে মুঠোফোনের যন্ত্রাংশ, চার্জার ও হেডফোন উৎপাদন করা হবে। টেকনোর কারখানায় মাদারবোর্ড তৈরি হচ্ছে।

সব মিলিয়ে দেশে মুঠোফোনশিল্পের যাত্রাটি জোরেশোরে শুরু হয়েছে। উদ্যোক্তারা করছেন রপ্তানির চিন্তাও। একটি চালান যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাচ্ছে ওয়ালটন।

জনপ্রিয় হচ্ছে দেশের তৈরি মুঠোফোন। ছবি: সাইফুল ইসলাম
জনপ্রিয় হচ্ছে দেশের তৈরি মুঠোফোন। ছবি: সাইফুল ইসলাম
মুঠোফোন সেবার শুরুর কথা

বাংলাদেশে মুঠোফোন সেবা পরিচালনা বা অপারেটর লাইসেন্স দেওয়া হয় ১৯৮৯ সালে। বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৮৯ সালে বেতার যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন তিন ধরনের লাইসেন্স দিয়েছিল তখনকার বাংলাদেশ সরকার। সেগুলো হলো পেজার, মুঠোফোন এবং নদী এলাকায় বেতার যোগাযোগব্যবস্থার লাইসেন্স। দেশে মোবাইল টেলিযোগাযোগ সেবার যাত্রা শুরু হয় এভাবে। কার্যত দেশের প্রথম মোবাইল অপারেটর সিটিসেল।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে ঢাকার কিছু মানুষ হাতে বড় বড় মুঠোফোন নিয়ে ঘুরতেন, যা দেখে অবাক হতেন অন্যরা।

১৯৯৬ সালে সিটিসেলের একক আধিপত্য ভেঙে যায়। সরকার গ্রামীণফোন, একটেল (এখন রবি) এবং সেবা টেলিকমকে (এখন বাংলালিংক) মুঠোফোন সেবা দেওয়ার জন্য লাইসেন্স পায়। এখন দেশের মুঠোফোন সেবার গ্রাহকের সাড়ে ১৬ কোটির বেশি। জনসংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে! মনে রাখতে হবে, একজন মানুষের একাধিক সিম থাকতে পারে।

শুরুতে নানা ব্র্যান্ডের ফিচার ফোন দেশে আমদানি হয়েছে। যখন মুঠোফোন সাধারণ মানুষের হাতে উঠতে শুরু করে, তখন একক আধিপত্য ছিল নকিয়া ব্র্যান্ডের। প্রথম দেশীয় ব্র্যান্ড সিম্ফনি। ২০০৮ সালে জার্মানির সিমেন্স ব্র্যান্ডের মুঠোফোন ব্যবসা গুটিয়ে যাওয়ার পর সেখানকার কয়েকজন কর্মকর্তা সিম্ফনি ব্র্যান্ডের মুঠোফোন বাজারজাত শুরু করেন। শুরুতে তাঁরা চীন থেকে মুঠোফোন তৈরি করিয়ে আনতেন। ২০১২ সালে দেশে তৃতীয় প্রজন্মের ইন্টারনেট সেবা বা থ্রি–জি চালুর পর কম দামের সিম্ফনি ফোন ব্যাপক বাজার পায়।

আমদানি থেকে দেশে মুঠোফোন তৈরির যাত্রা শুরু হয় ২০১৭ সাল থেকে।

 সরকারি নীতি

মুঠোফোনশিল্পের আজকের যাত্রার শুরুটা হয়েছিল সরকারি নীতি দিয়ে। উদ্যোক্তারা জানান, দেশে মুঠোফোন তৈরির কারখানা করতে সরকার উৎসাহ দেওয়া শুরু করে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট থেকে। ওই বাজেটে মুঠোফোনের ৪৪টি যন্ত্রাংশে বড় ধরনের শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়। ৪১টি যন্ত্রাংশে আমদানি শুল্ক করা হয় ১ শতাংশ, যা আগে ৫ থেকে ২৫ শতাংশ ছিল। বিপরীতে তৈরি করা মুঠোফোন আমদানিতে শুল্ক ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়।

নীতির ফলে একদিকে আমদানি করা মুঠোফোনের খরচ বেড়ে যায়, অন্যদিকে দেশে তৈরি করলে খরচ কমে যায়।

২০১৮ সালের ২৮ জুন জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেখানে বলা হয়, মুঠোফোন উৎপাদনে কিছু যন্ত্রাংশ উৎপাদন করা এবং ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন করার শর্তে মূল্য সংযোজন কর (মূসক/ভ্যাট) পুরোপুরি অব্যাহতি দেওয়া হয়। আবার সংযোজনের ক্ষেত্রে ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়।

২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে আরও ৪৪টি যন্ত্রাংশের শুল্ক কমানো হয়। বিপরীতে বিদেশি তৈরি মোবাইল আমদানিতে শুল্ক ১০ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়। ফলে এখন আর বিদেশ থেকে আনা মুঠোফোন দিয়ে বাজার ধরা যাচ্ছে না। এ কারণে একের পর ব্র্যান্ড কারখানা করছে।

৯টি কারখানা

মুঠোফোন সেট তৈরিতে এগিয়ে ওয়ালটন। তারাই প্রথম দেশে কারখানার কাজ শুরু করে। আবার তারাই সবচেয়ে বেশি যন্ত্রাংশ উৎপাদন করে। গাজীপুরের চন্দ্রায় ওয়ালটনের কারখানা উদ্বোধন করা হয় ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে। যদিও বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয় ২০১৮ সালের মাঝামাঝি। একই বছরের জুনে স্যামসাং ব্র্যান্ডের মুঠোফোন সংযোজন শুরু করে ফেয়ার ইলেকট্রনিকস লিমিটেড।

সিম্ফনি ব্র্যান্ডের মুঠোফোন বাজারজাতকারী এডিসন গ্রুপের কারখানাটি ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে উদ্বোধন করা হয়। তাদের মুঠোফোন বাজারে আসে ডিসেম্বরে।

এরপর টেকনো ব্র্যান্ডের মুঠোফোন বাজারজাতকারী ট্রানশান, ভিভো, অপো, ফাইভস্টার, উইনস্টার ও লাভা ব্র্যান্ডের ফোনের কারখানা হয়।

সব মিলিয়ে এখন অন্তত ৯টি কারখানা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বাজার হিস্যাধারীদের মধ্যে কারখানা করার ক্ষেত্রে বাকি রয়েছে মুঠোফোন ব্র্যান্ড হুয়াওয়ে, শাওমি এবং নকিয়া।

৪৩% দেশে

মুঠোফোনের বাজার নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো সমীক্ষা নেই। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাবে, ২০১৯ সালে দেশে ৩ কোটি ২৮ লাখ মুঠোফোন বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে দেশে তৈরি অথবা সংযোজিত প্রায় ১ কোটি ৪২ লাখ ইউনিট। শতকরা হিসাবে যা ৪৩ শতাংশ।

আলোচ্য বছরে দেশে স্মার্টফোন বিক্রি হয়েছে ৭৭ লাখ, যার মধ্যে ৫৪ লাখ দেশে তৈরি অথবা সংযোজিত। বাকিটা বৈধ ও অনানুষ্ঠানিক পথে বাংলাদেশে আসে। অবৈধভাবে আসা মুঠোফোন ঠেকাতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। যেটি চালু হলে অবৈধ মুঠোফোন ব্যবহার করা যাবে না।

দেশে তৈরি, মান কেমন

দেশে কারখানা চালু করার পর দুটো মডেলে ১২০ দিনে রিপ্লেসমেন্ট গ্যারান্টি (ত্রুটি দেখা দিলে বদলে দেওয়া) দিয়েছিল স্যামসাং। ফেয়ার ইলেকট্রনিকসের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মেসবাহ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ফেরত আসার হার ছিল ১ শতাংশের অনেক কম। এটা খুবই ভালো নজির। তিনি বলেন, দেশে সংযোজনে মানের দিক দিয়ে কোনো হেরফের হয় না; বরং আরও ভালো পাওয়া যাচ্ছে।

এডিসন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকারিয়া শহীদ বলেন, ‘বাংলাদেশের কারিগরি কর্মীরা খুবই দ্রুত শিখতে পারে। আমাদের কারখানায় একজন বিদেশি কর্মীও নেই। মানের ক্ষেত্রেও আমরা ভালো ফল পাচ্ছি।’

 রপ্তানির সম্ভাবনা কতটুকু

দেশে তৈরি স্মার্টফোনের প্রথম চালানটি এ মাসে যুক্তরাষ্ট্রে যাবে। রপ্তানিকারক ওয়ালটন। যুক্তরাষ্ট্রের একটি ব্র্যান্ড ওয়ালটনের কাছ থেকে স্মার্টফোন নিচ্ছে। ওয়ালটন দাবি করেছে, অরিজিনাল ইকুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার (ওইএম) হিসেবে ওই ব্র্যান্ডটিকে স্মার্টফোন তৈরি করে দিচ্ছে ওয়ালটন। ফলে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগযুক্ত ওয়ালটনের তৈরি স্মার্টফোনগুলো আমেরিকার বাজারে বিক্রি হবে।

সিম্ফনি দেশের চাহিদা পূরণ করে ২০২২ সালে রপ্তানি করার লক্ষ্য ঠিক করেছে। তারা মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে মুঠোফোন রপ্তানির সম্ভাবনা দেখছে। সিম্ফনি ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কায় ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে বলে জানান জাকারিয়া শহীদ।

টেকনো ব্র্যান্ডের মুঠোফোন বাজারজাতকারী ট্রানশান বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী রেজওয়ানুল হক বলেন, চীনে খরচ অনেক বাড়ছে। সেখানে একজন শ্রমিকের মজুরি ৫০ হাজার টাকা। বাংলাদেশে ৮ হাজার টাকা। ফলে ভারত ও ভিয়েতনামের পাশাপাশি বাংলাদেশ মুঠোফোন তৈরির কেন্দ্র হতে পারে।

 দুই পক্ষ

মুঠোফোনের কারখানা করা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে দুটি পক্ষ রয়েছে। এক পক্ষ উৎপাদনকারী, তারা চায় উৎপাদনকারী ও সংযোজনকারীর মধ্যে উচ্চ হারে কর পার্থক্য থাকুক। আরেক পক্ষ বলছে, কর ছাড় পেতে যন্ত্রাংশ উৎপাদনের যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবসম্মত নয়।

মুঠোফোনের একটি যন্ত্রাংশের নাম পিসিবি। শর্তানুযায়ী উৎপাদনকারী হতে হলে পিসিবি তৈরি করতে হবে। বিদেশি কয়েকটি ব্র্যান্ড বলছে, বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ড নিজেরা সবকিছু তৈরি করে না। তারা সংযোগশিল্পের মাধ্যমে তা তৈরি করিয়ে নেয়। কেউ তৈরি করে চিপসেট, কেউ এলসিডি, কেউ আবার ক্যামেরার লেন্সের ক্ষেত্রে দক্ষ। এ ক্ষেত্রে অ্যাপলের উদাহরণ দেন। বলেন, অ্যাপল সবকিছু তৈরি করিয়ে নেয়। নিজেরা করে না।

ট্রানশান বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী রেজওয়ানুল হক বলেন, কেসিংয়ের একটি মোল্ডের দাম কোটি টাকা। একটি মোল্ড দিয়ে অন্তত ১০ লাখ কেসিং তৈরি না হলে খরচ উঠবে না। কেসিং, পিসিবি ইত্যাদি একেকটি যন্ত্রাংশ তৈরির জন্য একটি কারখানা হতে পারে, যেখান থেকে সবাই তৈরি করিয়ে নেবে। নীতিমালায় এ বিষয়টি থাকা দরকার।

অবশ্য ওয়ালটন মোবাইলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এস এম রেজওয়ান আলম বলেন, দেশের বর্তমান কর–কাঠামো অনুযায়ী আমদানিকারকদের সঙ্গে সংযোজনকারীদের করভারের পার্থক্য ৩০ শতাংশ। কিন্তু সংযোজনকারীদের সঙ্গে উৎপাদনকারীদের কর ভারের পার্থক্য মাত্র ৫ শতাংশ। এর ফলে দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও নতুন আর কোনো উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে না।

বল এখন সরকারের কোর্টে।

 
Topic Tags
Share: